হার্ট সুস্থতার সম্পূর্ণ গাইড: রোগী ও সাধারণ মানুষের জন্য
লেখক: ডঃ মনজুরুল আলম, প্রধান, হৃদরোগ বিভাগ
হার্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হার্ট হলো আমাদের শরীরের “পাম্পিং মেশিন”। এটি রক্ত সারা শরীরের কোষে পৌঁছে দেয় এবং অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে। হার্টের সমস্যা শুধু শারীরিকভাবে প্রভাব ফেলে না, মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনমানকেও প্রভাবিত করে। তাই হার্ট সুস্থ রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণ হার্ট রোগ ও লক্ষণ
১.করোনারি আর্টারি ডিজিজ (Coronary Artery Disease)
- হার্টের রক্ত সরবরাহ কমে গেলে ঘটে।
- লক্ষণ: বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি।
২. হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack)
- রক্তনালী বন্ধ হলে হৃদপেশি অক্সিজেন পায় না।
- লক্ষণ: হঠাৎ বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘামের সঙ্গে অসহ্য অস্বস্তি।
৩. হাইপারটেনশন / উচ্চ রক্তচাপ
- দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ ছাড়া থাকে হার্ট, কিডনি ও চোখে সমস্যা ঘটায়।
- লক্ষণ: মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, চোখে ঝাপসা দেখা।
৪. হার্ট ফেলিওর (Heart Failure)
- হার্ট ঠিকমতো রক্ত পাম্প করতে পারে না।
- লক্ষণ: শ্বাসকষ্ট, পা ফোলা, ক্লান্তি।
হার্ট সুস্থ রাখার ১০টি মূল উপায়
১. স্বাস্থ্যকর ডায়েট
- তাজা ফল ও সবজি নিয়মিত খান।
- লবণ ও চিনি সীমিত করুন।
- ফ্যাটি মাছ, বাদাম, হোল গ্রেইন অন্তর্ভুক্ত করুন।
- প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান।
২. নিয়মিত ব্যায়াম
- প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম করুন।
- হাঁটা, সাইক্লিং বা যোগ ব্যায়াম করতে পারেন।
৩. ধূমপান ও মদ্যপান এড়ান
- সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্য হার্টের জন্য মারাত্মক।
- মদ্যপান সীমিত করুন বা পুরোপুরি বাদ দিন।
৪. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম
- প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।
- শরীর ও মনের চাপ কমান।
৫. স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ
- ধ্যান, হালকা ব্যায়াম, হবি বা গান শুনুন।
- মানসিক চাপ কমাতে রিল্যাক্সেশন খুব জরুরি।
৬. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
- ব্লাড প্রেসার, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
- ডাক্তার প্রদত্ত ফলোআপ মেনে চলুন।
৭. ওষুধ যথাসময়ে গ্রহণ
- হার্ট ওষুধ ডাক্তার নির্দেশমতো নিন।
- নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করবেন না।
৮. হাইড্রেশন
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- ডিহাইড্রেশন হার্টের জন্য ক্ষতিকর।
৯. ওজন নিয়ন্ত্রণ
- সুস্থ ওজন বজায় রাখুন।
- অতিরিক্ত ওজন থাকলে হার্টের উপর চাপ বেড়ে যায়।
১০. মনিটরিং ডিভাইস ব্যবহার
- স্মার্টফোন বা ওয়্যারেবল দিয়ে হার্ট রেট ট্র্যাক করুন।
- নিয়মিত নোটিশ বা রিমাইন্ডার ব্যবহার করুন।
রোগীর করণীয় (Post-Operative Care)
- ডাক্তার প্রদত্ত ওষুধ নিয়মিত সময়মতো নিন।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও হালকা ব্যায়াম করুন।
- হার্ট সার্জারির পরে স্ট্রেস কমাতে ধ্যান বা হালকা হবি করুন।
- যেকোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ (বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি) দেখা দিলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।
- নিয়মিত চেকআপ করুন।
সচেতনতা ও সতর্কতা
- ধূমপান, অতিরিক্ত চিনি ও ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলুন।
- হঠাৎ ভারী ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন।
- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরল থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
- হার্টে সমস্যা থাকলে অপসার্জারি বা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো চিকিৎসা পরিবর্তন করবেন না।
FAQ: সাধারণ মানুষের প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: হার্টের জন্য কোন খাবার সবচেয়ে ভালো?
উত্তর: হোল গ্রেইন, বাদাম, ফ্যাটি মাছ, তাজা সবজি ও ফল।
প্রশ্ন ২: প্রতিদিন কতটা ব্যায়াম জরুরি?
উত্তর: ২০–৩০ মিনিট হালকা কার্ডিও বা হাঁটা।
প্রশ্ন ৩: স্ট্রেস কমানোর সহজ উপায় কি?
উত্তর: ধ্যান, হালকা ব্যায়াম, শখের কাজ বা সঙ্গী/বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটানো।
প্রশ্ন ৪: কবে ডাক্তার দেখানো জরুরি?
উত্তর: বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দ্রুত ক্লান্তি বা হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে।
চূড়ান্ত পরামর্শ
- নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
- ওষুধ ও চিকিৎসা নিয়মিত মেনে চলুন।
- স্ট্রেস কমান ও জীবনযাপন সুস্থভাবে করুন।
স্মরণ করুন: হার্ট সুস্থ থাকলে জীবনও সুস্থ থাকে। ছোট পরিবর্তন বড় প্রভাব ফেলে।



