বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস ২০২৬
উচ্চ রক্তচাপ: নীরব ঘাতক সম্পর্কে সচেতন হোন
লেখক: Professor AKM Manzurul Alam
Professor and Head of the Department of Cardiac Surgery
National Institute of Cardiovascular Diseases (NICVD), Dhaka.
উচ্চ রক্তচাপ বা Hypertension বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশেও দিন দিন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো—অনেক মানুষ দীর্ঘদিন এই রোগে আক্রান্ত থাকলেও কোনো স্পষ্ট উপসর্গ অনুভব করেন না। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় “Silent Killer” বা নীরব ঘাতক।
বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে আমাদের সবার উচিত এই রোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
উচ্চ রক্তচাপ কী?
যখন রক্তনালীর ভেতরে রক্তের চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে এবং দীর্ঘসময় ধরে স্থায়ী হয়, তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়।
সাধারণভাবে একজন সুস্থ মানুষের রক্তচাপ প্রায় ১২০/৮০ mmHg ধরা হয়।
যদি নিয়মিতভাবে রক্তচাপ ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি থাকে, তবে তা উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেন উচ্চ রক্তচাপ বিপজ্জনক?
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে—
- হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক
- স্ট্রোক
- কিডনি বিকল হওয়া
- হার্ট ফেইলিউর
- চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
- মস্তিষ্কের রক্তনালীতে জটিলতা
কার্ডিয়াক সার্জারির রোগীদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। অনেক সময় দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ হৃদযন্ত্রের গঠন ও কার্যক্ষমতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
উচ্চ রক্তচাপের কারণসমূহ
উচ্চ রক্তচাপের পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। যেমন—
জীবনযাত্রাজনিত কারণ
- অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ
- তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার
- ধূমপান ও তামাক সেবন
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
- মানসিক চাপ
- স্থূলতা
শারীরিক ও বংশগত কারণ
- পারিবারিক ইতিহাস
- ডায়াবেটিস
- কিডনি রোগ
- বয়স বৃদ্ধি
- হরমোনজনিত সমস্যা
উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ
অনেকের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে কিছু সাধারণ উপসর্গ হতে পারে—
- মাথাব্যথা
- মাথা ঘোরা
- বুক ধড়ফড় করা
- শ্বাসকষ্ট
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- ঝাপসা দেখা
লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়?
১. নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন
৪০ বছরের পর নিয়মিত রক্তচাপ মাপা উচিত। যাদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের ইতিহাস আছে, তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
২. লবণ কম খান
অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম প্রধান কারণ। খাবারে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার কমাতে হবে।
৩. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন
- শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খান
- তেল-চর্বি কমান
- ফাস্টফুড ও প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলুন
৪. নিয়মিত ব্যায়াম করুন
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
৫. ধূমপান ও তামাক বর্জন করুন
ধূমপান রক্তনালী সংকুচিত করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন
অনেক রোগী ওষুধ শুরু করার পর কিছুদিন ভালো অনুভব করলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনো ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
“Measure Your Blood Pressure Accurately, Control It, Live Longer.”
নিজে সচেতন হোন, পরিবারকেও সচেতন করুন। সুস্থ হৃদয় মানেই সুস্থ জীবন।
Professor AKM Manzurul Alam
Professor and Head of the Department of Cardiac Surgery
National Institute of Cardiovascular Diseases (NICVD), Dhaka.



